মাদারীপুরের Shibchar Upazila-এর এক সাধারণ পরিবারে জন্ম আল কাইফের। চারপাশে ছিল সাধারণ জীবন, সাধারণ মানুষ, আর সাধারণ স্বপ্ন। কিন্তু কাইফের ভিতরে ছিল একটু অন্যরকম আগুন। সে ছোট থেকেই বুঝত সবাই শুধু বেঁচে থাকে, কিন্তু সবাই নিজের পরিচয় তৈরি করতে পারে না। ছোটবেলায় সে খুব বেশি কথা বলত না।
বন্ধুরা মাঠে খেলত, আড্ডা দিত, কেউ কেউ শুধু সময় নষ্ট করত। কাইফও তাদের সাথে থাকত, হাসত, ঘুরত, কিন্তু তার মাথার ভিতরে সবসময় অন্য কিছু চলত। সে ভাবত “একদিন আমি এমন কিছু করব, যাতে মানুষ আমাকে নাম ধরে চিনবে।”
তখন তার কাছে বড় কোনো ল্যাপটপ ছিল না, দামি সেটআপ ছিল না, এমনকি সবসময় ভালো ইন্টারনেটও থাকত না। একটা সাধারণ মোবাইল ফোন আর ইচ্ছাশক্তি নিয়েই শুরু হয়েছিল তার পথচলা। রাতের পর রাত সে ইউটিউব দেখে ডিজাইন শেখার চেষ্টা করত। প্রথমদিকে কিছুই বুঝত না। একটা পোস্টার বানাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যেত। কখনো ফন্ট ভালো লাগত না, কখনো কালার ঠিক হতো না, কখনো নিজের কাজ নিজেই ডিলিট করে আবার নতুন করে শুরু করত। কিন্তু একটা জিনিস সে কখনো ছাড়েনি চেষ্টা।
অনেকেই তাকে বলত,
“এইসব ডিজাইন-ফিজাইন করে কি হবে?”
কেউ বলত,
“বাস্তব জীবনে এগুলার দাম নাই।”
আবার কেউ শুধু হাসত।
কাইফ কারো সাথে তর্ক করত না। সে শুধু মনে মনে একটা কথা বলত
“সময় একদিন সব উত্তর দিবে।”
ধীরে ধীরে তার কাজ বদলাতে শুরু করল। আগের সেই এলোমেলো ডিজাইনের জায়গায় আসতে লাগল ক্রিয়েটিভ চিন্তা। সে শুধু পোস্টার বানাত না, সে একটা ডিজাইনের ভিতরে অনুভূতি দেওয়ার চেষ্টা করত।
মানুষ তার কাজ দেখে বলতে শুরু করল “এই ডিজাইনে আলাদা একটা ভাইব আছে।”
তারপর শুরু হলো ছোট ছোট কাজ পাওয়া। কেউ ফেসবুক পোস্ট বানাতে দিল, কেউ রাজনৈতিক ব্যানার, কেউ ব্যবসার লোগো, আবার কেউ ভিডিও এডিটিং। কাজ ছোট হলেও কাইফ সেটাকে ছোট ভাবত না। কারণ সে জানত, ছোট কাজ থেকেই বড় পরিচয় তৈরি হয়। কাজ করতে করতে সে একটা জিনিস শিখে ফেলল ট্যালেন্ট গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ধারাবাহিকতা তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক রাত গেছে যখন সবাই ঘুমিয়ে ছিল, আর কাইফ একা মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নতুন ডিজাইন বানাচ্ছিল। চোখ লাল হয়ে যেত, মাথা ব্যথা করত, কিন্তু সে থামত না। কারণ তার ভিতরে একটা ভয় ছিল “আমি যদি এখন থেমে যাই, তাহলে হয়তো আর কখনো শুরু করতে পারব না।” ধীরে ধীরে তার পরিচিতি বাড়তে লাগল।
মানুষ তাকে শুধু “কাইফ” নামে না, “ডিজাইনার কাইফ” নামে চিনতে শুরু করল। তার বানানো পোস্টার শেয়ার হতে লাগল, তার ডিজাইনের স্টাইল কপি করতে লাগল অনেকে। কিন্তু সফলতার মাঝেও সে নিজের শিকড় ভুলে যায়নি। সে এখনো মনে রাখে শিবচরের সেই ছোট রাস্তা, বিকেলের আড্ডা, বৃষ্টির দিন, আর সেই সময়গুলো যখন কেউ তার উপর বিশ্বাস করেনি। কারণ সে জানে সংগ্রামের দিন ভুলে গেলে মানুষ নিজের আসল পরিচয়ও ভুলে যায়।
কাইফের একটা স্বপ্ন ছিল
সে শুধু নিজের জন্য বড় হতে চায় না। সে চায় এমন কিছু করতে, যাতে তার পরিবার গর্ব করে বলতে পারে, “ওই ছেলেটা আমাদের।” একসময় সে বুঝে গেল,
জীবনে সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধটা বাইরের মানুষের সাথে না… নিজের ভিতরের ভয় আর হতাশার সাথে। কিছু রাত আসে, যখন মনে হয় সব ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করছে। কিছু দিন আসে, যখন মনে হয় এত পরিশ্রমের কোনো মূল্য নেই। কিন্তু তারপরও সে আবার উঠে দাঁড়ায়। কারণ স্বপ্ন দেখা মানুষরা সহজে হার মানে না। তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো সে এখনো শিখছে। নিজেকে শেষ মনে করছে না। প্রতিদিন একটু একটু করে আগের দিনের নিজের চেয়ে ভালো হওয়ার চেষ্টা করছে। মানুষ এখন হয়তো তার কাজ দেখে প্রশংসা করে। কিন্তু তারা জানে না, এই জায়গায় পৌঁছানোর পিছনে কত রাতের ঘুম হারাম হয়েছে, কত হতাশা ছিল, কত চুপচাপ কষ্ট ছিল।
আল কাইফ জানে, তার পথ এখনো অনেক বাকি। হয়তো সামনে আরও ব্যর্থতা আসবে, আরও কষ্ট আসবে। কিন্তু সে এটাও জানে যে ছেলে শিবচরের ছোট জায়গা থেকে বড় স্বপ্ন দেখতে শিখেছে, তাকে এত সহজে থামানো যাবে না। কারণ কিছু মানুষ জন্ম থেকেই আলাদা হয় না… সংগ্রাম তাদের আলাদা বানিয়ে দেয়।
আর আল কাইফ সেই মানুষদের একজন। ✨
